এপ্রিল ২২, ২০২৪

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে‌ বুধবার ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফের সফররত প্রতিনিধি দলের বৈঠকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্ততি, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ, ট্যারিফ কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, পণ্যের বহুমুখীকরণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়।

করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়ালেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ফের ধাক্কা খেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয় বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঋণ নিয়ে সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। একই দিনে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করে তারা।

বৈঠকে পাঁচ সদস্যের আইএমএফ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির দক্ষিণ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান রাহুল আনান্দ। অপরদিকে সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অতিরিক্ত সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।বৈঠকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্ততি, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ, ট্যারিফ কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, পণ্যের বহুমুখীকরণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাণিজ্য সচিব আইএমএফ কর্মকর্তাদের জানান, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে কাজ করছে সরকার। প্লাস্টিক, তথ্য-প্রযুক্তি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দীর্ঘ মেয়াদে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কাজ করছে বলেও জানান তিনি।রপ্তানি আয় কমার কারণ সম্পর্কে বাণিজ্য সচিব জানান, চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত আয় ভালো ছিল। সেপ্টম্বর-অক্টোবরে তা কিছুটা কমে গেছে। ডিসেম্বরে বড়দিন আসছে। শীত মৌসুমও শুরু হয়ে গেছে। ফলে আশা করা যাচ্ছে আগামীতে রপ্তানি আয় ফের বাড়বে।সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের পর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে বাংলাদেশ। উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলাদেশকে। এছাড়া উন্নয়নশীল দেশের মযার্দা পাওয়ার পর কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।বৈঠকে এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি জানতে চায় আইএমএফ।

প্রতিনিধি দলকে বাণিজ্য সচিব জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক পণ্য থেকে। আর বাংলাদেশি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ।ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে, তারা ২০২৬ সালের পর আরও তিন বছর বাংলাদেশের পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। এ ছাড়া এই সুবিধা অব্যাহত রাখতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে বাংলাদেশ ছয় বছর সময় চেয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নেয়া যাবে। কাজেই রপ্তানি নিয়ে বাংলাদেশের শঙ্কার কারণ নেই।উত্তরণকালে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ তুলে ধরেন সচিব। বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ভুটানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। নেপালের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টিও প্রায় চূড়ান্ত। পাইপলাইনে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। সিঙ্গাপুর ও জাপানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হচ্ছে শিগগিরই।

প্রতিনিধি দলকে তিনি জানান, ভারতের সঙ্গে সমন্বিত অংশীদারত্ব বা সেপা চুক্তির ব্যাপারে দুই সরকার প্রধান একমত হয়েছেন। এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগেই এসব দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব দেশের সঙ্গে চুক্তি হলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়বে।বাণিজ্য সচিব আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি এ বিষয়ে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করছে। ওই কমিটির অধীনে সাতটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারাও প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় রিজার্ভের চাপ কমাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বৈঠকে এলসি খোলার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চায় আইএমএফ।

জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ভোগ্যপণ্য ও অপ্রয়োজনীয়সহ নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারে ওইসব পণ্যের দাম কমছে। ফলে বাংলাদেশেও ওইসব পণ্যের দাম কমে আসবে শিগগিরই।কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও কথা বলেছে আইএমএফ। রাজস্ব আদায় বাড়াতে কী ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জানতে চায় আইএমএফ।মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকার ট্যারিফ কাঠামো যৌক্তিকীকরণ নিয়ে কাজ করছে। এটি চূড়ান্ত হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বাস্তবায়ন করবে। তা ছাড়া রাজস্ব আয় বাড়াতে কর-জাল সম্প্রসারণসহ নানামুখী সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে এনবিআর। বাণিজ্য নীতি বা ট্রেড পলিসির খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে ট্যারিফ কমিশন। এসব পদক্ষেপের ফলে রাজস্ব আহরণ আরও বাড়বে।

শেয়ার দিয়ে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *